October 19, 2026, 7:47 pm

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
লালনের মানবতাবাদী দর্শন ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বানে শেষ হলো তিন দিনের তিরোধান দিবসের আয়োজন অর্থ লেনদেনের কোন প্রশ্নই উঠে না, কুষ্টিয়া যুবদল সভাপতির সংবাদ সম্মেলন কুষ্টিয়াতে আওয়ামী লীগের সাবেক দুই এমপির বিরুদ্ধে দুদকের মামলা অনুমোদন খোকসায় বেকারির ওভেন বিস্ফোরণে প্রধান মিস্ত্রি নিহত, দগ্ধ ২ লালনের শিক্ষা স্কুলে পৌঁছে দিতে চান প্রধানমন্ত্রী: তথ্য উপদেষ্টা তিরোধান দিবসের ভাবগাম্ভীর্যে ছেঁউড়িয়ায় হয়েছে তিনদিনের লালন মেলা কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণির হাজার শিক্ষার্থীর নবীনবরণ মক্কার মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, দুই বাংলাদেশী নারী-পুরুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর রূপপুরে স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা স্থাপন, পর্যবেক্ষণে ২০ হাজার যন্ত্রপাতি সমাবর্তনের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে সকল কমিটিকে নির্দেশনা উপাচার্যের

লালনের মানবতাবাদী দর্শন ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বানে শেষ হলো তিন দিনের তিরোধান দিবসের আয়োজন

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় আয়োজিত তিন দিনের অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে সোমবার সন্ধ্যায়। আলোচনা সভা, লালনসংগীত, সাধুসঙ্গ ও মেলাকে ঘিরে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান পালিত হয়েছে তিরোধান দিবসের ভাবগাম্ভীর্য ও আধ্যাত্মিক আবহে।
লালনের স্মৃতিবিজড়িত ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে তিন দিন ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বাউল সাধক, অনুসারী ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি বিদেশ থেকেও লালনভক্ত ও তাঁর দর্শনের অনুসারীরা এ আয়োজনে অংশ নেন। তবে পুরো আয়োজনেই ছিল তিরোধান দিবসের শোক, শ্রদ্ধা ও সাধনার আবহ। লালনের গান, দর্শন ও মানবতাবাদী চিন্তার মধ্য দিয়েই তাঁকে স্মরণ করেন ভক্ত-অনুসারীরা।
তিন দিনের অনুষ্ঠানে আলোচনা সভা, বাউল গান, সাধুসঙ্গ ও মেলার আয়োজন করা হয়। লালনের তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা তাঁর অহিংস, মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক দর্শন সমাজের গভীর থেকে গভীরে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন।
বক্তারা বলেন, লালন কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, বর্ণ কিংবা সম্প্রদায়ের মধ্যে তাঁর দর্শনকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। মানুষের পরিচয়কে সবার আগে স্থান দিয়ে তিনি জাত-পাত, ধর্মীয় বিভাজন ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও সম্প্রীতিই ছিল তাঁর দর্শনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
তাঁরা মনে করেন, বর্তমান সময়ে সমাজে নানা ধরনের বিভাজন, অসহিষ্ণুতা ও বৈষম্য যখন মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করছে, তখন লালনের দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়েছে। তাই লালনকে শুধু গান ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে স্মরণ না করে তাঁর চিন্তা ও দর্শনকে মানুষের জীবন ও সমাজব্যবস্থায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
আলোচনা সভায় বক্তারা আরও বলেন, লালনের দর্শন চর্চা ও প্রচারের প্রধান দায়িত্ব বাউল সাধক ও অনুসারীদের হলেও এ দায়িত্ব শুধু তাঁদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। একটি আধুনিক, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকেও দায়িত্ব নিতে হবে। সরকার যদি দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি বৈষম্যহীন আধুনিক সমাজ গড়ে তুলতে চায়, তাহলে লালনের মানবতাবাদী দর্শন থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।
বক্তারা বলেন, জাত-পাতের বিভেদ কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি লালনের দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মানুষের মর্যাদা ও অধিকারকে সমানভাবে বিবেচনা করে একটি সহনশীল সমাজ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও সমাজের লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে লালনের দর্শন হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশনা।
তিরোধান দিবস উপলক্ষে ছেঁউড়িয়ায় আসা বাউল সাধকদের অনেকেই লালনের গান ও দর্শন নিয়ে সাধুসঙ্গে অংশ নেন। আখড়াবাড়ির পরিবেশে ছিল ধ্যান, সাধনা ও লালনসংগীতের আবহ। বাউলদের কণ্ঠে লালনের গান হয়ে ওঠে তাঁকে স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানানোর অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
তিন দিনের আয়োজনে মেলাও বসে। মেলায় লোকজ সামগ্রী, হস্তশিল্প, খাবারসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান ছিল। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা দর্শনার্থীরা মেলা পরিদর্শনের পাশাপাশি লালনের আখড়াবাড়ি ঘুরে দেখেন এবং তাঁর স্মৃতির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেন।
লালনের তিরোধান দিবস প্রতিবছরই ছেঁউড়িয়ায় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়। এ উপলক্ষে দেশ-বিদেশ থেকে লালনভক্ত ও অনুসারীরা ছেঁউড়িয়ায় এসে সমবেত হন। তাঁদের কাছে এটি কেবল একটি স্মরণানুষ্ঠান নয়; বরং লালনের দর্শনকে নতুন করে উপলব্ধি ও চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
লালন গবেষকদের মতে, লালনের দর্শন বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম শক্তিশালী মানবতাবাদী ধারার প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে অন্তর্নিহিত মানবিক সত্তাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর গান ও সাধনায় ধর্মীয় সংকীর্ণতা, জাত-পাতের বিভেদ এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে প্রশ্ন উচ্চারিত হয়েছে, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, লালনকে স্মরণ করার প্রকৃত অর্থ শুধু তাঁর গান গাওয়া কিংবা প্রতিবছর তিরোধান দিবস পালন করা নয়। তাঁর দর্শনকে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ধারণ করাই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে লালনের মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তাকে তুলে ধরতে হবে।
তাঁরা আরও বলেন, ধর্ম-বর্ণ-জাতিগত বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠা করা গেলে সমাজে সহনশীলতা ও সম্প্রীতি বাড়বে। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে লালনের দর্শন হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও মানবিক শক্তি।
সোমবার সন্ধ্যায় তিন দিনের আয়োজন শেষ হলেও ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে লালনের গান ও দর্শনের আবহ যেন থেকে যায়। তিরোধান দিবসের ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে আবারও উচ্চারিত হয় লালনের সেই মানবিক বাণী—মানুষকে বিভাজনের নয়, বরং মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার আহ্বান।
লালনের তিরোধান দিবসের এবারের আয়োজন তাই শুধু স্মরণ ও শ্রদ্ধার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তাঁর অহিংস, মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক দর্শনকে সমাজের গভীরে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও নতুন করে সামনে এনেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

MonTueWedThuFriSatSun
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031 
© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net